সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলোচিত জেনারেল মাসুদ চৌধুরী গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদন

২৪ মার্চ ২০২৬

শেয়ার

এএনবি: সাবেক সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী-কে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্টন থানায় দায়ের করা একটি মানবপাচার মামলায় মঙ্গলবার তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আদালতে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। ডিবি জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিবি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ফেনী জেলায় তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং সেসব মামলায় তিনি পলাতক থাকায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। এছাড়া ফেনীতে আরও তিনটি এবং ডিএমপিতে পাঁচটি মামলাসহ মোট আটটি মামলা তদন্তাধীন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সিআইডিতেও তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তদন্ত চলছে।

ওয়ান-ইলেভেন সময়ের আলোচিত কর্মকর্তা
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর পর তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন এবং আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।

ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে সে সময় পর্দার আড়ালে থেকে যৌথবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়।

সেনা-নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী সে সময় শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হতো। তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন।

ওয়ান-ইলেভেনের পটভূমি
২০০৬ সালের শেষ দিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে এবং জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা আসে।

এই পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং বাতিল করা হয় ২২ জানুয়ারির নির্বাচন। ওই দিনটি পরবর্তীতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিতি পায়।

ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময়ে আলোচিত বিষয় ছিল তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’, যার মাধ্যমে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেতা তারেক রহমান-সহ অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গ্রেফতার হন। তারেক রহমানের ওপর গোয়েন্দা হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে, যেখানে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

সেনা ও কূটনৈতিক জীবন
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭৫ সালে সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেন। এক-এগারোর সময় তিনি নবম ডিভিশনের জিওসি ছিলেন। পরে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালে তাকে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট করা হয় এবং পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। একই বছর তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।

রাজনীতি ও ব্যবসায় সম্পৃক্ততা
অবসর নেওয়ার পর ২০১৮ সালে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি দলের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হন।

অবসরের পর তিনি জনশক্তি রফতানি ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে কারসাজি, অর্থপাচার ও প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গত বছর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রায় ১০০ কোটি টাকা অর্থপাচারের অভিযোগে তারসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তদন্ত সংস্থার দাবি, তার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

সর্বশেষ

সব খবর